অধ্যায় তিরানব্বই: মানবজাতির নিরাশার স্থান

দয়া করে থামো, এটা মোটেই সঠিক বা প্রকৃত বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়। আনন্দে পরিপূর্ণ একজন সুখী, আরামপ্রিয় মানুষ 2639শব্দ 2026-03-20 07:20:40

গ্যালিলিওর প্রথম প্রজন্মের দূরবীক্ষণ যন্ত্রটি মাত্র তেত্রিশ গুণ শক্তিশালী ছিল। ব্যাসও ছিল মাত্র চার সেন্টিমিটার। গ্যালিলিওর দৃষ্টিশক্তি কতটা প্রখর ছিল, তা ভাবা যায় না। এই সামান্য যন্ত্র দিয়েই তিনি শনির উপগ্রহ দেখতে পেরেছিলেন। সাধারণ মানুষ এই দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে বৃহস্পতি বা তার উপগ্রহ দেখতে পারত না। কিন্তু গ্যালিলিও তা সম্ভব করেছিলেন। আধুনিক যুগেও বিজ্ঞানীরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, সেই সময়ের কারিগরি ও প্রযুক্তি সম্পর্কে। মাত্র তেত্রিশ গুণ শক্তি সম্পন্ন দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে এত দূরের বস্তু কীভাবে দেখা সম্ভব, তা নিয়ে পরে বহু চিন্তা হয়েছে। তবে গ্যালিলিও শনির উপগ্রহ পর্যবেক্ষণের রেকর্ড রেখে গেছেন।

প্রাচীন চীনের ইতিহাস গ্রন্থে শনি গ্রহের উল্লেখ আছে। তাহলে প্রাচীন মানুষ এত দূরের গ্রহ কীভাবে দেখল? তারা কি কেবল চোখের উপরই নির্ভর করত? ইয়েজেন নিজের চোখের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, কেবল চোখের উপর নির্ভর করেই। কেবল চোখেই? প্রাচীনকালের মানুষের দৃষ্টিশক্তি কতটা তীক্ষ্ণ ছিল, তারা আকাশের বস্তু পর্যবেক্ষণ করতে পারত! অথচ আমাদের আজকের মানুষেরা নির্ভর করে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর।

আর একটি বিষয় হচ্ছে, আমাদের মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। এমনকি তা আলোর গতির চেয়েও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাবিশ্ব ক্রমাগত বাড়ছে ও বিকশিত হচ্ছে। আগে সবাই ভাবত, মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরু থেকেই এমন ছিল। আসলে মহাবিশ্ব সবসময়ই প্রসারিত হচ্ছে। আমরা যেসব গ্রহ দেখি, তারা সকলেই আলোর গতির চেয়েও দ্রুত গতিতে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

সবাই নিশ্চয়ই জানো, আমাদের মহাবিশ্ব মহাবিস্ফোরণ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। আজকের আকাশে সেই সৃষ্টির সমস্ত চিহ্ন সংরক্ষিত আছে। ছোট ছাত্ররা ইয়েজেনের কথা পুরোপুরি বুঝতে পারল না। ইয়েজেন বলল, আমরা এখন যে চাঁদ দেখি, সেটা এক মিনিট আগের চাঁদ। সূর্য যে দেখি, সেটা আট মিনিট আগের সূর্য। তাই, আমরা আকাশে যে সমস্ত তারা দেখি, তারা আসলে অনেক আগের চেহারা। আলোর জন্য সময় লাগে পৌঁছাতে। আমরা এখন যে অ্যানড্রোমিডা ছায়াপথ দেখি, সেটা পঁচিশ লক্ষ বছর আগের চেহারা।

ছোট ছাত্ররা টুকটাক বুঝে নিল। কেউ কেউ পুরোপুরি বুঝল। কেউ বলল, তাহলে মহাবিস্ফোরণের সময়ের দৃশ্য আকাশেই আছে। মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটেছে, সবই আকাশে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি আমরা এখন সূর্যে উড়ে যাই, তাহলে আট মিনিট আগের পৃথিবী দেখতে পাব।

কারণ, সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে আট মিনিট সময় লাগে। যদি আমরা মুহূর্তে অ্যানড্রোমিডা ছায়াপথে চলে যেতে পারি, তাহলে পঁচিশ লক্ষ বছর আগের পৃথিবী দেখতে পাব। তাই, আমরা আকাশ থেকে মহাবিস্ফোরণের সময়ের দৃশ্য দেখতে পারি। এই মহাশূন্য যেন সময়ের রেকর্ডার, এখানে ঘটনার সমস্ত ছাপ রয়ে গেছে।

ইয়েজেনের কথা এত সহজ ছিল যে ছোট ছাত্ররাও সহজেই বুঝতে পারল। কেউ বিস্মিত হয়ে বলল, আকাশ এত আশ্চর্য! তাহলে আমরা যে তারা দেখি, তা হয়তো কয়েক লক্ষ বা কয়েক কোটি বছরের পুরোনো। সত্যিই বিস্ময়কর, মহাবিশ্ব তো অসাধারণ। কিন্তু মহাবিস্ফোরণের সময় কেমন ছিল?

ইয়েজেন জানত, নিশ্চয়ই কেউ এমন প্রশ্ন করবে। সে বলল, মহাবিস্ফোরণের ঘটনাটি সত্যিই আধুনিক বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেছেন। একে বলা হয় মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ। এই বিকিরণ মহাবিস্ফোরণের পর থেকে থেকে যাওয়া চিহ্ন। এই আবিষ্কারের জন্য দুই বিজ্ঞানী নোবেল পদার্থবিদ্যা পুরস্কার পেয়েছিলেন। মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বও শত বছর পূর্ণ হয়নি। তবুও, এটি বর্তমানে মহাবিশ্ব সৃষ্টির সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মডেল। এমনকি আইনস্টাইনও প্রথমে এই তত্ত্বকে বিশ্বাস করেননি। তিনি মনে করতেন, মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরু থেকে অপরিবর্তিত। অথচ মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ সূত্র থেকেই উদ্ভূত হয়েছে।

ইয়েজেনের পেছনের বড় পর্দায় একটি ডিম্বাকৃতি ছবি ফুটে উঠল। ছবিতে লাল ও নীল অসংখ্য বিন্দু ছড়িয়ে আছে। ইয়েজেন বলল, এটি অসংখ্য তথ্য সংগ্রাহক দিয়ে মহাবিশ্বের সংকেত সংগ্রহ করে তৈরি। এটাই মহাবিস্ফোরণের সময়কার চিত্র, বিস্ফোরণের মুহূর্তের চিহ্ন।

প্রথমবারের মতো সবাই এই ছবি দেখল। মহাবিস্ফোরণের সময় এমনই ছিল? দেখতে তো সাধারণ কিছুই মনে হয় না। ইয়েজেন বলল, সবাই নিশ্চয়ই শুনেছ, মহাবিশ্ব একটি গোলক হতে পারে। এক অশেষ গোলক, যেমন আমরা পৃথিবীতে। যেখান থেকেই চলা হোক, অবশেষে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে হবে। তাই, কেউ কেউ বলে পৃথিবী থেকে মহাবিশ্বের গভীরে উড়ে গেলে এক দিন আবার পৃথিবীতেই ফিরে আসবে। কিন্তু এই মত ভুল।

ইয়েজেন ক্রমাগত সবাইকে নতুন তথ্য দিচ্ছিল। অনেক প্রচলিত ধারণা আসলে ভুল। এমনকি পাঠ্যবইয়ের তথ্যও ভুল হতে পারে।

যদি মহাবিশ্ব একটি গোলক হয়, তবে বাঁক বা কার্ভেচার থাকবেই। অর্থাৎ, মহাবিশ্বে কোথাও না কোথাও বাঁকাচোরা অংশ থাকবে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই আঠারোশ কোটি আলোকবর্ষ দূরত্বের কার্ভেচার পরিমাপ করেছেন। তাতে একটুও পরিবর্তন মেলেনি। যদিও স্বীকার করতে কষ্ট হয়, মহাবিশ্ব আসলে সমতল।

সমতল মহাবিশ্ব? এ তো আগে জানতাম না। এতদিন সবাই ভেবেছে মহাবিশ্বও এক বিশাল গোলকের মতো। এবার ইয়েজেন বলল, মহাবিশ্ব সমতল? মহাবিশ্ব এক অনন্ত বিস্তৃত সমতল, তাহলে তার বাইরে কী? মানুষ তো আজও মহাবিশ্বের প্রান্ত দেখতে পায়নি। বাইরের কিছুর কথা কল্পনা করা কঠিন।

কেউ বলল, মহাবিশ্ব কি আসলেই গোলক নয়? সমতল? সত্যি? মহাবিশ্ব এত বিস্ময়কর, সে এক অনন্ত সমতল? হয়তো তা নয়, শুধু আমরা সেখানে পৌঁছাতে পারি না।

এই বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠে ছাত্ররা মহাবিশ্ব সম্পর্কে গভীর ধারণা পেল। তারা মহাশূন্য ও নক্ষত্রের প্রতি আরও আগ্রহী হয়ে উঠল। মানব জাতির ভবিষ্যৎ ও লক্ষ্য মহাবিশ্বের অজানা পথে। আমাদের ভবিষ্যৎ গন্তব্য নক্ষত্ররাজি ও মহাসাগর, শুধু পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধতা নয়।

কিন্তু এখন মানুষের বিজ্ঞান ও মহাকাশ প্রযুক্তি খুবই পিছিয়ে। ইয়েজেন বলল, এখন মহাবিশ্ব আলোর গতির চেয়েও দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রযুক্তি আলোর গতিও ছুঁতে পারে না। একদিন যদি আলোর গতির মহাকাশযানও হয়, তবুও মহাবিশ্বের সীমানায় পৌঁছানো যাবে না। কারণ মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে, আমরা অনেক ছায়াপথেই পৌঁছাতে পারব না। এমনকি আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ গুচ্ছেও পৌঁছানো অসম্ভব। ইয়েজেনের কণ্ঠ তখন কিছুটা বিষণ্ন।

এটাই মানবজাতির বর্তমান অবস্থা। ধরা যাক, আমরা আলোর গতির মহাকাশযান আবিষ্কার করলাম, তবুও আমরা কুমারী ছায়াপথ গুচ্ছের বাইরে যেতে পারব না। বড়জোর পাশের অ্যান্ড্রোমিডা ছায়াপথে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু আলোর গতিতে ছুটলেও সেখানে পৌঁছাতে পঁচিশ লক্ষ বছর লাগবে।