অধ্যায় ৩০: সমাবেশ

প্রশাসনিক ভাগ্য উজ্জ্বল বড় বাঁশি একবার বাজিয়ে দিন। 3201শব্দ 2026-03-19 11:14:12

ভাইয়েরা, একটু সমর্থন করো, সুপারিশ নিয়ো, সংগ্রহ নিয়ো।

অধ্যায় ৩০ : সমাবেশ

দেখার দরকার নেই, সময়বিহীন জানে, সদ্য ঘরে ফেরা ছোট ভাই সময়রোগ কথোপকথনে মেতেছে। সে ভয় পায়, ছোট ভাই হয়তো কিছু বলে ফেলবে, যা গোপন রাখা উচিত। তাই দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ঘামের গন্ধে ভরা এক শরীরকে পাশে টেনে নেয়, তার হাতে ঘুরতে থাকা বাস্কেটবলটি ছিনিয়ে নিয়ে ইশারা করে, আর বলবে না। সময়রোগ যদিও পড়াশোনায় দুর্বল, তবে এমন ছোটখাটো ব্যাপারে বেশ চতুর। মুহূর্তেই সে বড় ভাইয়ের ইঙ্গিত বুঝে নেয়, তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে, ‘‘আমি একটু আগে গ্রামের ওল্ড ওয়াংয়ের কাছ থেকে শুনলাম, আজ তুমি নাকি অনেকক্ষণ ওভারটাইম করবে। ভাবলাম, আমার চেয়েও দেরি হবে তোমার ফিরতে। অথচ তুমি আমার আগেই ঘরে ফিরে এসেছ।’’

সময়বিহীন ছোট ভাইয়ের বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হয়ে গোপনে একখানা থাম্বস-আপ দেখায়, ‘‘হ্যাঁ। আসলে আমিও এখানেই এসে পৌঁছেছি। ওভারটাইমের কথাই ছিল, কে যেন বলল আগামীকাল সপ্তাহান্ত, এতে কর্তার মন ভালো হলো, তাই আর লাগল না। ও হ্যাঁ, আবার স্কুলে বাস্কেটবল খেলতে গিয়েছিলি? দেখ তো কেমন ঘামে ভিজে গেছিস, তাড়াতাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।’’

সময়বিহীন মেঝেতে বাস্কেটবলটি দুবার ঠুকিয়ে আবার ছোট ভাইকে ফিরিয়ে দেয়, ‘‘জিতেছিস, না হেরেছিস?’’

সময়রোগ গর্বে হেসে ওঠে, ‘‘হে হে, দাদাভাই, আমরা কবে হারলাম? এক-আশি উচ্চতা, একশ সত্তর কেজি গাঁঠি, দেখো এই পেশি! এই শরীর নিয়ে হারব নাকি? বলো তো?’’

সময়বিহীন মাথা নাড়ে, পরে ছোট ভাইয়ের পোশাক দেখে একটু দুঃখ পায়—গাঢ় নীল শর্টস ফিকে হয়ে গেছে, পায়ে যে কেডস, সেটাও দুই বছর আগে তারই কিনে দেওয়া। এখন ছোট, পুরোনো হয়ে গেছে। সময়বিহীন মনে মনে অনুতপ্ত হয়, তার তো আরও ভালো থাকা উচিত ছিল। কমপক্ষে এমন নয় যে সারাদিন অলস ঘুরে বেড়াবে, পকেটে আধটাকা থাকে না, নিজের খাবার, পোশাক, বাসস্থানও ঠিকমতো হয় না।

দ্বিতীয় বছরেই সময়বিহীনকে প্রাদেশিক শহরে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল, তখন সে ছিল কতটা গর্বিত! একবার জেলায় তার সম্মানে আয়োজিত সংবর্ধনায় শ্রম দপ্তরের উপ-জেলা প্রশাসক নিজে বলেছিলেন, ‘‘ছোট সময়, কোনো সমস্যা হলে বলো। তুমি বা তোমার পরিবারের, আমরা যথাসাধ্য সমাধান করব।’’

সে জানত, উপ-জেলা প্রশাসক আসলে তাকে খুশি করতে চাইছেন; আসল লক্ষ্য তার অবস্থান। তখনই তার মনে ঘৃণা আসে—সমাজকে এমন লোকেরা নষ্ট করে। চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করেছিল, কেবল সৌজন্যের খাতিরে সংযত হয়েছিল। বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিল, ‘‘ধন্যবাদ, আমার কোনো চাহিদা নেই।’’

কিন্তু উপ-জেলা প্রশাসক ভেবেছিলেন সে বলতে লজ্জা পাচ্ছে, নিজেই বলেন, ‘‘তোমার পরিবারের ব্যাপারে জেলা বিশেষভাবে খোঁজ নিয়েছে। তোমার ছোট ভাই তো মাধ্যমিক পাস করেও কলেজে ভর্তি হতে পারেনি, বাড়িতেই বসে আছে এক বছর। এবার তো তার ষোল। এই বয়সে অলস থাকা ভালো নয়। বড় ভাই হিসেবে ওর জন্য কিছু ভাবোনি?’’

সময়বিহীন সত্যি কথাই বলেছিল, ‘‘দোষ ওর, গ্রাম্য ছেলেদের ভবিষ্যৎ তো কলেজেই নির্ভর করে, ও কলেজে চান্সই পায়নি, ভবিষ্যৎই বা কী? একমাত্র দোষ ওর নিজের।’’

উপ-জেলা প্রশাসক বুঝলেন, সে ইচ্ছা করেই পাশ কাটাচ্ছে, সরাসরি বললেন, ‘‘দেখো সময়, তোমাদের পরিবারের কথা ভেবে জেলা বিশেষ একটি পদ রাখছে, তোমার ভাইয়ের চাকরির ব্যবস্থা হবে।’’

শুনে সঙ্গে সঙ্গে সময়বিহীন বুঝল, এটা দুর্নীতির ফাঁদ। উপ-জেলা প্রশাসক শেষ কথা বলার আগেই সে প্রত্যাখ্যান করল, ‘‘না না, তা চলবে না। যদি আমার ভাই শহরের নাগরিক হতো, তাহলে আমিই তোমাদের কাছে আসতাম—নীতি অনুযায়ী। কিন্তু ও তো গ্রাম্য, এটা নীতিবিরুদ্ধ, দুর্নীতি। আমি পারি না, একদম না। ভুল করতে চাই না।’’

সময়বিহীনের এমন কথা শুনে উপ-জেলা প্রশাসক নিশ্চুপ হয়ে যান। আর তাই সময়রোগের চাকরির ব্যাপারটা ঝুলে যায়। এসব মনে করে সময়বিহীনের বুকটা মোচড় দেয়। সে আর ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাতে পারে না, যদিও ভাই কোনোদিন অভিযোগ করেনি—সে তো জানেই না, এমন কিছু হয়েছিল। এখন সময়বিহীন মনে করে, একমাত্র ক্ষতিপূরণ হিসেবে কিছুটা আর্থিক সাহায্যই দিতে পারে। যদিও সে শুধু এক ক্ষুদ্র সরকারি কর্মচারী, বিশেষত এই পরিস্থিতিতে বেশি কিছু দেওয়া সম্ভব নয়। মন খারাপ করে ভাবে—যাই হোক, একজোড়া জুতো আর এক সেট পোশাক কিনে দিতেই হবে। একটু স্থির হয়ে ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখে, ‘‘চল, বলটা ভেতরে নিয়ে যা, দেখছি তোর পোশাক আর জুতো বেশ পুরোনো। কাল আমার সঙ্গে শহরে চল, নতুন একটা সেট কিনে দেব।’’

সময়রোগ যেন অমূল্য রত্ন পেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে দুপা একসাথে ঠুকিয়ে দাদার সামনে একেবারে নিখুঁত সামরিক স্যালুট দেয়, ‘‘ধন্যবাদ দাদা!’’ বাস্কেটবল বুকে চেপে নিজের ঘরে চলে যায়।

এতে সময়বিহীনের মনে আরও বেশি কষ্ট লাগে—এত বড় হয়ে গেছে, একটা নতুন পোশাকে এতটা খুশি! যদি সেই সময় উপ-জেলা প্রশাসককে না ফিরিয়ে দিত, হয়তো এমন হতো না। আবার ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখে, গলাটা যেন আটকে আসে, কথাই বেরোয় না। তারপর আবার ফিরে এসে বাবার সামনে বসে, চুপচাপ পুরোনো চায়ের স্বাদ উপভোগ করতে থাকে। মনে মনে ভাবে—সব কিছু বদলে গেছে, কেবল এই চায়ের স্বাদই অপরিবর্তিত। কতক্ষণ কেটেছে জানে না, বাবা-মা’র ডাকা অতিথিরা একে একে এসে হাজির হয়। সবাই সময়বিহীনের ছেলেবেলার বন্ধু। একসাথে দেখা হতেই সবাই হেসে খেলে, আপন মনেই গল্পে মেতে ওঠে।

এরপর সময়বিহীনের মন খারাপটা দ্রুত মুছে যায় বন্ধুদের উষ্ণতায়। দুটো টেবিলে গাদাগাদি করে পঁচিশ জন বসেছে। যদিও জায়গা কম, কেউ মন দেয় না, আনন্দটাই মুখ্য।

তিন পেগ পান করার পর, সময়বিহীন দেখে ছোট বোন তুল্য বন্ধু উ লিংঝি পাশে বসে, মুখের লাগাম সামলাতে পারে না, এক টুকরো পুরোনো মাংস তার বাটিতে দিয়ে বলে, ‘‘লিংঝি, অনেক বড় হয়েছ, এখনও একা?’’

মা কথাটি ধরে নেয়, ‘‘ছোট শি এলেন না? মা তো বলেছিল ডেকে আনতে, তুমি তো কখনও কথা শোনো না।’’

লিংঝি একবার সময়বিহীনের দিকে তাকিয়ে, মুখ লাল হয়ে যায়, কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, ‘‘তার কাজে ব্যস্ত, কারখানায় ওভারটাইম করতে হচ্ছে, আসতে পারেনি।’’

সময়বিহীন একটু থমকে যায়, ভাবে নিশ্চয় কিছু একটা আছে? আবার ছোট ভাইয়ের মুখে রহস্যময় ভাব দেখে, তখনই বুঝে যায়, ‘‘ওহ, লিংঝি বোনের কারো সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে? দারুণ তো! ডেকেছ, আনোনি—এটা ঠিক হয়নি। অন্তত আমাদের দেখাও তো উচিত ছিল। কী ওভারটাইম! দেখো, নাম্বার দাও, আমি ফোন করে ডাকি।’’

‘‘না না, এখনও কিছু নিশ্চিত হয়নি।’’ লিংঝির মুখ কান পর্যন্ত লাল, দ্রুত বলে, ‘‘একদম ফোন দিও না দাদা, তুমি ওকে চেনো না, ফোন দিলেও আসবে না।’’

সময়রোগ এক চুমুকে গ্লাস খালি করে বলে, ‘‘দেখো, শিলিয়াংটা কতটা অযোগ্য! আমার দাদার সামনে আসতে ভয় পায়, সে-ই কি আমার বোনকে বিয়ে করবে? আমি আগেই বলেছি, আমাদের বাড়িতে ঢুকতে চাইলে আগে দাদার কাছে পাশ করতে হবে, দাদা পছন্দ না করলে আশা ছেড়ে দে। নির্ঘাত গাধা, কপালপোড়া এক জন, ব্যাঙের মতো হাঁসের মাংস খেতে চায়! কী সব ছাইপাঁশ!’’

সময়বিহীনের বুকটা ধড়াস করে ওঠে, সবটা বুঝতে পারে। ছোট ভাই বরাবর বড় এক বছরের লিংঝিকে পছন্দ করত, মাধ্যমিক স্কুলে লিংঝি ছিল নামকরা সুন্দরী, সময়রোগও দারুণ আকর্ষণীয়। মূলতঃ বেশ মানানসই ছিল। কিন্তু লিংঝি চেয়েছিল স্থায়ী চাকরি, চেহারা যেমনই হোক। শেষে সে বেছে নেয় শিলিয়াংকে। সময়রোগের আশা শেষ। আবারও সময়বিহীন নিজের পূর্বের সিদ্ধান্তে লজ্জিত হয়। কিছু বলতে যাবে—

লিংঝি আগেই বলে ওঠে, সময়রোগের দিকে আঙুল তুলে, ‘‘তুই! আমার ব্যাপারে তোকে কে কথা বলতে বলেছে?’’ যতই চেপে রাখতে চায়, মুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট। সে জানে, ছোট ভাই শিলিয়াংকে পছন্দ করে না, কিন্তু নিজের জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের অধিকার তার নিজস্ব, সময়রোগের কিছু বলার নেই—এটাই সে সহ্য করতে পারে না।

এমন পরিস্থিতি দেখে, ব্যাপারটা যাতে বাড়ে না, সময়বিহীন বাধ্য হয়ে সময়রোগকে ধমক দেয়, ‘‘রোগ, কী করছিস, লিংঝির ব্যাপারে তোকে কে বলেছে কথা বলতে? এখানে তোর কোনো অধিকার নেই। আগে বুঝে নে, মনে রাখিস, লিংঝি তোর দিদি। এত বড় হয়েও শালীনতা নেই? চুপ করে থাক!’’

সময়বিহীনের কথায় সময়মতো পরিস্থিতি সামলে যায়, লাল হয়ে কান্নার মুখে হাসে লিংঝি, ‘‘দাদাই তো ঠিক বলেছে, ছোট ভাইকে শাসন করা দরকার, নইলে দিন দিন বেয়াদবি বাড়বে, আমার ব্যাপারে কথা বলতে আসে, বেয়াদবি ছাড়া কিছু নয়।’’

আর সময়রোগ? সে কেবল গম্ভীরভাবে গোঁজ গোঁজ করে, বড় ভাইয়ের কঠোর মুখ দেখে আর টুঁ শব্দ করে না, শুধু খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। মাধ্যমিক পাস করে কলেজে চান্স না পেয়ে, সময়রোগ ঘরের কাউকেই সহ্য করতে পারে না, শুধু বড় ভাই ছাড়া। কয়েক বছর ধরে মাঠের কাজ পছন্দ না, আশায় ছিল দাদা চাকরির ব্যবস্থা করবে। আজও কিছু হয়নি, আর দাদার অবস্থা দিন দিন খারাপ—তাই আশা ফিকে। মনে দুঃখ জমে, সারাদিন বাইরের অজানা পথে ঘোরে, তিন-চার দিন পর পর ঝামেলায় জড়ায়। মা-বাবা সারাদিন দুশ্চিন্তা করলেও উপায় নেই, কিছুই করতে পারেন না—ছাড়াই দিয়েছেন।

এখন বড় ছেলে বকছে দেখে মনে মনে খুশি হলেও, বুকের ভেতরটা হাহাকার করে। তাই কথার মোড় ঘুরিয়ে দেয়, বাবা বলেন, ‘‘বিহীন, এই লংবিয়াও’র কী খবর? ওকে না বললি, আমরা আর অপেক্ষা করিনি। দেখ, সবাই খাওয়া শেষ করে ফেলল, ওর দেখা নেই। ফোন করে একটু তাড়া দে না?’’

মা কথা ধরে বলেন, ‘‘হ্যাঁ, না এলে আর খাওয়ার কিছু থাকবে না। বিহীন, ফোন দে, তাড়া দে ওকে। ওর তো ফোন আছে, গাড়ি আছে, আসতে দেরি হবে না।’’